রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
খবর
দুঃস্বপ্ন ও বোবায় ধরা: জ্বিনের এ্যাটাক নাকি ভিন্ন কিছু?
2019-02-09 22:14:26
মাইদুল ইসলাম

দুঃস্বপ্ন ও বোবায় ধরা: জ্বিনের এ্যাটাক নাকি ভিন্ন কিছু?
========================
আমরা সময় সময় দুঃস্বপ্ন দেখি। দুঃস্বপ্ন সাধারনত জ্বিন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। মানুষ যখন যাদু বা জ্বিনের আসরের শিকার হয়, তখন সে ঘনঘন দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে। শয়তান মানুষকে মাঝেমধ্যে দুঃস্বপন দেখিয়ে ভয় দেখায়। কোনো কোনো দুঃস্বপ্ন আমাদের সারাদিনের কল্পনা বা অনর্থক চিন্তাভাবনাও হতে পারে। আবার কখনো এমনও হয়, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন কোন ব্যক্তি সারাদিন আজেবাজে কল্পনা করে, রাতে সেগুলোই ভীতিকর স্বপ্ন হিসেবে দেখে। সে এটিকে শয়তানের বা জ্বিনের কান্ড ভাবতে থাকে। আসেলে সেটা তার অসুস্থ মনের কল্পনা। এজন্যই স্বপ্নের ব্যখ্যা একটা আপেক্ষিক বিষয়; একই স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যখ্যা হয় এবং ব্যখ্যা অতটা সহজ নয়।

স্বপ্ন নিয়ে কিছু মৌলিক কথা
--------------------
রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, স্বপ্ন তিন প্রকার-
১। শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিকর দুঃস্বপ্ন: এই স্বপ্নের মাধ্যমে শয়তান আদম সন্তানকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে।
২। মানুষের কল্পনা: মানুষ সারাদিন যা কল্পনা করে, ঘুমে সেটাই স্বপ্নে দেখে।
৩। আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ: এটিকে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নবুওয়তের চল্লিশ অংশের একাংশ। অর্থাৎ এটি সত্য স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সতর্কবার্তা হিসেবে কাউকে দেখানো হয়।

নবীদের স্বপ্ন ওহী আর উম্মাহর স্বপ্ন সন্দেহযুক্ত। স্বপ্ন কখনো সত্যের দলিল হতে পারে না । সত্যের প্রামানিকতা নির্ভর করে কুরআন ও সুন্নাহর উপর। এমন হতেই পারে, মানুষ কোন স্বপ্নকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ ভাবছে; আদতে তা শয়তানের একটা ওয়াওয়াসা, যা সে স্বপ্নে প্রক্ষেপন করেছে। আবার অনেক সুসংবাদ স্বপ্নকেও মানুষ ভুল ব্যখ্যা করতে পারে। অনেক সময় এমন হয়, ব্যক্তি সারাদিন প্রবৃত্তির টানে যা নিয়ে কল্পনা করেছে, স্বপ্নে সে সেটাই দেখছে। প্রবৃত্তি তো নফসের কাছে মজাদারই হয়। ফলে স্বপ্নটা মনের মত হওয়ায় অজ্ঞ ব্যক্তিরা এ ধরনের স্বপ্নকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুংবাদ ভাবতে থাকে। আসল বিষয় হল সে নফসের কল্পিত প্রবৃত্তিকে আল্লাহর দান সুসংবাদের সপ্নের সাথে মিলিয়ে ফেলেছে।

স্বপ্নের ব্যখা নির্ভর করে পারিপার্শিক অবস্থা, ব্যক্তির ঐ সময়ের মানসিকতা, স্বপ্নের প্রেক্ষাপট ও নানা আনুসাঙ্গিক বিষয়ের উপর। ফলে ব্যক্তি ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের কারনে একই স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যখ্যা হয়ে থাকে। একই কারনে দুঃস্বপ্ন যেমন যাদু ও জ্বিনের আসরের লক্ষণ হতে পারে; তেমনি দুঃস্বপ্নের অন্যন্য যৌক্তিক ব্যখ্যাও দাঁড়াতে পারে।

এ জন্যই স্বপ্নের ব্যখ্যা বই পড়ে শিখার বিষয় নয়; স্বপ্ন বই পড়ে ব্যখ্যা করারও বিষয় নয়। বই পড়ে স্বপ্ন সম্পর্কে।সর্বোচ্চ কিছুটা ধারনা পাওয়া যেতে পারে। জনৈক মনীষী বলেছিলেন, ‘স্বপ্নকে হুটহাট ব্যখ্যা করা উচিৎ নয়।; কারন সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের একটি অংশ; সুতরাং নবুওয়াতের এ অংশটি যেন খেলার পাত্রে পরিনত না হয়। ‘
ইউসুফ (আ) যখন জেলে, একদিন বলেছিলেন, ‘আমার রব আমাকে ‘তাওয়িল’ মানে স্বপ্নের ব্যখ্যা শিখিয়েছেন।’ সুতরাং স্বপ্ন হল একটি প্রজ্ঞা, যা সরাসরি ওহীর নুর িএবং আল্লাহর বিশেষ রহমতে সৌভাগ্যবানরা তা লাভ করে।

বোবায় ধরা
---------
রাতদুপুরে হঠাতই ঘুম ভেঙে গেল। অনুভব করছেন, খুব ভারী কিছু ভর করেছে আপনার বুকের ওপর। এত ভারী! যেন আপনি নিঃশ্বাসই নিতেই পারছেন না। শরীরের কোনো অংশ আর নাড়াতে পারছেন না, এমনকি মুখ থেকেও কথা বেরুচ্ছে না। কেমন অসহায় লাগতে পারে তখন? নিঃশন্দেহে পরিস্থিতিটা ভীতিকরই বটে! এমন পরিস্থিতিকেই আমরা বোবায় ধরা বলি। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের মাঝে বোবায় ধরা অতি কমন একটি সমস্যা।

বোবায় ধরা কথাটা শুনতে যেন কেমন কেমন লাগে! বোবায় ধরার সাইন্টিফিক নাম হল ‘স্লিপ প্যারালাইসিস’। বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস মূলত একটা ইন্দ্রিয়ঘটিত বিষয়। শরীর যখন গভীর ঘুমের এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে যায়, মস্তিষ্ক তখন সতর্ক হয়ে জেগে ওঠে; কিন্তু দেহ যদি তখনো ঘুমিয়ে থাকে, এমনটা ঘটতে পারে। তখন অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতার অবতারনা হয়। 
বোবায় ধরা বুঝতে মনে হয় আপনার কষ্ট হচ্ছে? আপনার কাছে মনে হচ্ছে, এটা তো স্বপ্ন নয়; আমি তো বাস্তবেই অনুভব করেছি যে, কেউ আমাকে চেপে ধরেছে। হ্যাঁ.. আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনি যা দেখেছেন, তা স্বপ্ন নয়। কারন আপনার বিবেক তো তখন জাগ্রত। এজন্যই তো আপনি এটিকে স্বপ্ন বলতে নারাজ। কিন্তু আমাকে বলতে পারেন? আপনি তখন হাত পা নাড়াতে পারেন না কেন? কারন আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তখনো ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি। ফলে মস্তিষ্কের সাথে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একটা গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে। বোবয় ধরার সময় মস্তিষ্ক আর শরীরের সম্পর্কটা যেন ঠিক এ রকম - ‘দুংখিত এই মূহুর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না!’

বোবায় ধরার লক্ষণ 
----------------
বোবায় ধরলে একেক জনের একেক রকম অনভূতি হয়। কেউ অনুভব করেন, 
১। তাকে স্বপ্ন সম্পর্কে। যাতীয় কিছু চেপে ধরেছে বা আক্রমণ করছে; 
২। কেউ কেউ একটা উৎকট দুর্গন্ধ পান; 
৩। কেউ বা ভয়ানক কোনো প্রাণি দেখতে পান ইত্যাদি।
স্লিপ প্যারালাইসিস মূলত এক ধরনের হ্যালুসিনেশন অবস্থার সৃষ্টি করে। সাধারণত যাদের ঘুমের সমস্যা আছে, তারাই বেশি স্লিপিং প্যারালাইসিসে ভোগে।

বোবায় ধরার কারন
-------------------
বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিসের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো স্ট্রেস ও চাপের মধ্যে থাকা এবং যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্রামের অভাব তৈরী হওয়া। এছাড়াও বোবা ধরার আরও কিছু কারণ আছে। যেমন মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সমস্যা, হাত-পায়ের মাংসপেশিতে খিঁচ ধরা, অনিদ্রা, বিষন্নতা ইত্যাদি। তবে হ্যাঁ... ওস্তাদ ইমরান বলেন, বোবায় ধরা কখনো কখনো জ্বিনের আসরের একটা বিশেষ ধরন হতে পরে।

সংক্ষেপে বলা যায়, বোবায় ধরা না স্বপ্ন; আর না বাস্তব কিছু; বরং স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝের এক ভিন্ন জগৎ। এটি স্বপ্ন না হওয়ায় মানুষ এটিকে বাস্তব ভাবে। মানুষের ধারনা, বোবায় ধরা মানেই জ্বিন তাকে এ্যাটাক করেছে। আসলে বিষয়টা তেমন নয়। বোবা জ্বিন বলতে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব নেই পৃথিবীতে।

আরো সহজ করে বললে---
জ্বিনের আসর জাগ্রত অবস্থায় হতে পারে; ঘুমের অবস্থায়ও হতে পারে। জাগ্রত অবস্থায় জ্বিন কাউকে আসর করলে, ব্যক্তি বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে। ব্যক্তি কখনো সিজেফ্রেনিয়ার রুগী, কখনো হিসটেরিয়ার রুগী আবার কখনো মৃগী রুগীর মত আচরন করে। আর জ্বিন যদি ঘুমন্ত অবস্থায় কাউকে এ্যাটাক করে, সেটা দুঃস্বপ্ন আকারে প্রকাশ পেতে পারে আবার কখনো ব্যক্তির ‘স্লিপিং প্যারালাইসিসে’র অভিজ্ঞতাও হতে পারে। তাই বলে সিজোফ্রেনিয়া, হিসটেরিয়া বা মৃগী রুগী মানেই জ্বিনের রুগী নয়, তেমনি দুঃস্বপ্ন বা বোবায় ধরা মানেই জ্বিনের এ্যাটাক নয়। প্যারানরমাল সমস্যার এই এক সমস্যা! সমস্যা নির্ণয় করা বড় মুশকিল!

বোবায় ধরলে ও দু:স্বপ্ন দেখলে পরামর্শ
-----------------------------
১। ঘুমের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলুন। রাসুল (স) ঘুমের সাধারন রুটিন মেইনটেইন করতেন। তিনি ইশার পর দ্রুত ঘুমিয়ে যেতেন এবং ভোরে তাহাজ্জুদের আগেই উঠে যেতেন। তিনি রাতে দীর্ঘ দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন। আবার তিনি দ্বিপ্রহরে সামন্য বিশ্রাম নিতেন।

২। স্বপ্ন সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ যাই হোক, তা মানুষকে বলে বেড়াবেন না। ইয়াকুব আলাইহি ওয়সাল্লাম ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুসংবাদের স্বপ্ন বলতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, চাদঁ-সূর্য ও এগারোটা তারা তাকে সিজদা করছে। ঘটনাটা সুরা ইউসুফের শুরুতেই আছে। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়োসাল্লাম দুঃস্বপ্ন বলতে নিষেধ করেছেন।

৩। কখনো দুঃস্বপ্ন দেখলে বিতাড়িত শয়তান থেকে পানাহ চান এবং বলুন, আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম। তারপর বাম দিকে সামন্য থুথু ছিটান তিন বার। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘...সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুথু দেয়।’(৬৩)
৪। অজুর সঙ্গে ডান কাত হয়ে ঘুমাবেন এবং ঘুমের দুআ পড়ে ঘুমান। বিছানায় যেয়ে আয়তুল কুরসী, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে মুষ্টিবদ্ধ হতে ফু দিয়ে সারা শরীর মাসেহ করুন।

৫। বোবায় ধরা বা স্লিপিং প্যারালাইসি সমস্যাটা সাময়িক। কিন্তু যদি এটা ঘন ঘন হতে থাকে এবং কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার জন্ম দেয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

৬। এক দু’দিন দুঃস্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যদি এ ধরনের স্বপ্ন সচারচরই দেখতে থাকেন, তবে রুক্বইয়া করুন এবং সমস্যা নির্ণয়ে যত্নবান হোন।

 

৭। নিশ্চিত হোন, আপনার স্বপ্ন সারা দিনের কল্পনার ইম্প্যাক্ট কিনা। অহেতুক কল্পনা, অবান্তর অলীক কল্পনা এবং মন্দ কল্পনা এড়িযে চলুন। মন্দ কল্পনা আসলে আউযু বিল্লাহ পড়ুন এবং বলুন, لا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلا باللَّهِ